
বাংলাদেশের অনলাইন নিউজ পোর্টাল: যে পরিবর্তন আমাদের সবার পড়ার অভ্যাস বদলে দিল
আমার বাবা প্রতিদিন সকালে চা হাতে নিয়ে প্রথম আলো পড়েন। কাগজটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টান, কিছু জায়গায় দাগ দেন, কখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। অন্যদিকে আমি ঘুম থেকে উঠে প্রথমে ফোনটা হাতে নিই। দুই মিনিটে পাঁচটা সাইটের হেডলাইন চোখের সামনে।
দুই প্রজন্ম। দুই অভ্যাস। একই খবর।
এই পার্থক্যটাই আজকের গল্প। বাংলাদেশে অনলাইন সংবাদ কীভাবে এলো, কী বদলালো, আর এই বদলের আসল অর্থ কী—সেটা নিয়ে।
একসময় খবরের জন্য অপেক্ষা করতে হতো
মনে পড়ে ছোটবেলায় বাবার হাতে পত্রিকা আসত সকাল সাতটায়। তার আগে জরুরি কিছু জানার উপায় ছিল না। রেডিও ছিল, টিভি ছিল—কিন্তু সেগুলো সব সময় খবর দিত না।
একটা ঘটনা ঘটলে পরদিন সকালে পত্রিকায় পড়ে জানতাম। সেটাই ছিল স্বাভাবিক।
আজ বিষয়টা উল্টো। ঘটনা ঘটার দুই মিনিটের মধ্যে ছবি, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য—সব চলে আসে ফোনে। অপেক্ষা করতে হয় না।
এই বদলের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে অনলাইন নিউজ পোর্টাল।
শুরুটা কেমন ছিল
২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত ছিল। যাদের বাসায় কম্পিউটার ছিল, তারাও ধীর গতির ইন্টারনেটে ভুগতেন। ছবি লোড হতে মিনিট লাগত। ভিডিও দেখা প্রায় অসম্ভব।
তখনই কয়েকজন সাহসী মানুষ ভাবলেন—সংবাদ অনলাইনে দেওয়া যায় কি না।
bdnews24.com ২০০৫ সালে কাজ শুরু করে। ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর তারা বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় অনলাইন সংবাদ প্রকাশ শুরু করে। নিজেদের ওয়েবসাইটে তারা বলে—বাংলাদেশের প্রথম internet-only newspaper।
সে সময় এটা বড় ঝুঁকি ছিল। কারণ পড়ার লোক কতজন? বিজ্ঞাপন কে দেবে? পুঁজি কোথা থেকে আসবে?
কিন্তু তারা ঠিক পথেই হাঁটছিলেন। কারণ যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করতেন, তারা দ্রুত খবর চাইতেন। আর সেই দ্রুততার চাহিদাটা দিনদিন বাড়ছিল।
পুরোনো পত্রিকাগুলোও ধীরে ধীরে এলো
নতুন কিছু শুরু হলে পুরোনোরা চুপ করে থাকেন না।
প্রথম আলো অনলাইনে এসেছিল ২০০৯ সালে। তার আগে ২০০৮ সালে ই-প্রথম আলোর ঘোষণা এসেছিল। মানে, তারা বুঝেছিলেন—শুধু ছাপা কাগজে থাকলে হবে না।
তবে শুরুর দিকে অনেক পত্রিকা একটা ভুল করেছিল। তারা ছাপার কনটেন্ট হুবহু অনলাইনে তুলে দিত। আলাদা কিছু করত না।
কিন্তু পাঠক এটা চাইত না। অনলাইনে পড়তে চাইলে দ্রুত আপডেট চাই। শুধু ছাপার কপি নয়।
সময়ের সঙ্গে এই ধারণা বদলেছে।
ইন্টারনেট ব্যবহার এখন কতটা বেড়েছে
একটা সংখ্যা দিই।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের হিসাবে ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহকসংখ্যা ছিল ১৩১ দশমিক ৪২ মিলিয়ন।
মনে রাখবেন—এটি ব্যক্তির সংখ্যা নয়। এটি সক্রিয় ইন্টারনেট সংযোগের হিসাব। একই ব্যক্তির হাতে মোবাইল আর বাসায় ব্রডব্যান্ড—দুটোই থাকতে পারে।
তবু এই সংখ্যা একটা বড় ছবি দেয়। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর হাতে এখন ইন্টারনেট আছে। আর সেখানে খবর পৌঁছানোর সবচেয়ে সহজ পথ—অনলাইন।
এখন সংবাদ মানে শুধু ওয়েবসাইট নয়
অনেকেই ভাবেন—অনলাইন নিউজ মানে একটা ওয়েবসাইট।
আসলে ব্যাপারটা এখন অনেক বড়।
একটা অনলাইন নিউজ পোর্টাল এখন যা যা করে:
ওয়েবসাইটে সংবাদ প্রকাশ
ফেসবুকে শেয়ার
ইউটিউবে ভিডিও
লাইভ ব্লগ চালানো
ইনফোগ্রাফিক বানানো
মোবাইল নোটিফিকেশন পাঠানো
পডকাস্ট রেকর্ড করা
সার্চ ইঞ্জিনের জন্য আলাদা কনটেন্ট
মানে একটা খবর একাধিক রূপে বেরোয়। এক পাঠক পড়ে, আরেক জন দেখে, আরেকজন শোনে।
এটাই এখন স্বাভাবিক।
পাঠক এখন খবর পান আলাদা পথে
আগে খবর পাওয়ার পথ একটাই ছিল—সংবাদমাধ্যম।
এখন পথ অনেক।
কেউ ফেসবুকে দেখে।
কেউ ইউটিউবে দেখে।
কেউ সার্চ করে।
কেউ নোটিফিকেশন থেকে পড়ে।
কেউ বন্ধুর পাঠানো লিংকে যায়।
Reuters Institute-এর ২০২৬ সালের Digital News Report-এ একটা চমকপ্রদ তথ্য আছে।
গবেষণায় দেখা গেছে—৪৮টি দেশের গড় হিসেবে ৫৪ শতাংশ মানুষ এখন অনলাইনে সংবাদ পান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ভিডিও নেটওয়ার্ক থেকে। এটাই প্রথমবারের মতো সংবাদ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবসাইট বা অ্যাপকে ছাড়িয়ে গেল।
মানে কী?
মানে পাঠক আর সরাসরি পত্রিকার ওয়েবসাইটে যান না। তারা ফেসবুকে, ইউটিউবে, বা অন্য কোথাও গিয়ে খবর পান।
এটা সংবাদমাধ্যমের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রিন্ট মিডিয়া কি শেষ হয়ে যাচ্ছে?
এই প্রশ্নটা অনেকেই করেন।
আমার উত্তর—না।
প্রিন্ট মিডিয়া মরে না, বদলাচ্ছে।
ভাবুন তো—একটা অনলাইন সাইটে খবর ওঠে সেকেন্ডে। সেটা পড়ার সময় কত? দুই মিনিট? তিন মিনিট? তারপর আপনি ভুলে যান।
কিন্তু একটা দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যদি ছাপা কাগজে আসে, সেটা আপনি সংরক্ষণ করেন। বন্ধুকে দেখান। পরিবারের সদস্যকে পড়তে দেন।
আবার সম্পাদকীয়—যেটা একটি বিশ্লেষণ, শুধু তথ্য নয়—সেটা পড়তে বসতে হয়। সময় লাগে। মন লাগে।
অনলাইনে এই অভিজ্ঞতা তৈরি করা কঠিন। কারণ অনলাইনে পাঠক স্ক্রল করতে করতে দ্রুত চলে যান।
তাই প্রিন্ট আর অনলাইন শত্রু নয়। দুটোর আলাদা শক্তি আছে।
কোন সময় কোনটা ভালো
সহজভাবে বলি।
তাৎক্ষণিক খবরের জন্য অনলাইন। হঠাৎ কিছু ঘটলে সেটা অনলাইনে আসবে দ্রুত।
গভীর বিশ্লেষণের জন্য প্রিন্ট। দীর্ঘ প্রতিবেদন, বিশেষ আয়োজন, সম্পাদকীয়—এগুলো ছাপা কাগজের শক্তি।
সংরক্ষণের জন্য দুটোই। ছাপা কাগজ ফিজিক্যালি রাখা যায়। ডিজিটাল আর্কাইভ অনলাইনে রাখা যায়।
দ্রুত সন্ধানের জন্য অনলাইন। পুরোনো কোনো খবর খুঁজতে হলে অনলাইনে সার্চ দিন, সেকেন্ডে পেয়ে যাবেন।
তাই প্রশ্নটা হওয়া উচিত—কোনটা ভালো? না। কোনটা কোথায় ভালো—সেটাই আসল প্রশ্ন।
সংবাদ প্রতিষ্ঠান এখন নিজেদের বদলাচ্ছে
একটা সময় ছিল—প্রিন্ট আর অনলাইন আলাদা বার্তাকক্ষে কাজ করত। আলাদা সম্পাদক, আলাদা সাংবাদিক।
এখন অনেক প্রতিষ্ঠান এই দেয়াল ভেঙে দিয়েছে।
প্রথম আলোর একটা উদাহরণ দিই। ২০২০ সালে তারা ছাপা পত্রিকা আর অনলাইন বিভাগের আলাদা বার্তাকক্ষ একসঙ্গে মিলিয়ে দেয়।
মানে কী?
মানে একই সাংবাদিক ছাপা আর অনলাইন দুই জায়গার জন্য কাজ করেন।
এতে সুবিধা কী?
একই ঘটনা একবার যাচাই করলেই হয়। দুইবার কষ্ট করতে হয় না। আর তথ্যও নির্ভুল থাকে।
অনলাইন পোর্টাল এখন কতগুলো
একটা সরকারি তথ্য দিই।
২০২৬ সালে জাতীয় সংসদে জানানো হয়েছে—দেশে নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালের সংখ্যা ৪৭৪টি।
এর মধ্যে কয়েক ধরনের আছে:
সাধারণ অনলাইন পোর্টাল
দৈনিক পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ
আঞ্চলিক অনলাইন পোর্টাল
সংখ্যাটা কম না। ৪৭৪টি।
কিন্তু এখানে একটা সমস্যা আছে।
সব পোর্টাল সমান যাচাই করে না।
কিছু পোর্টালে নিজস্ব প্রতিবেদক আছে, সম্পাদক আছে, প্রক্রিয়া আছে।
আবার কিছু পোর্টালে কেউ শুধু ফেসবুক থেকে খবর তুলে ছাপে।
তাই পাঠক হিসেবে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।
পাঠকের দায়িত্বও বেড়েছে
একটা কথা সত্য—অনলাইন সংবাদ আমাদের দ্রুততা দিয়েছে।
কিন্তু দ্রুততার সঙ্গে দায়িত্বও এসেছে।
আগে খবর আসত সম্পাদিত হয়ে। সম্পাদক যাচাই করতেন, তারপর ছাপা হতো।
এখন যেকোনো কেউ যেকোনো কিছু লিখে দিতে পারেন। সেটা যাচাই করার দায়িত্ব অনেক সময় পাঠকের কাঁধে পড়ে।
তাই একটা অভ্যাস তৈরি করুন।
খবর পড়ার সময় দেখুন:
কে লিখেছে?
কবে প্রকাশিত?
সূত্র কী?
একই খবর অন্য কোথাও আছে কি?
এই চারটি প্রশ্ন করলেই অনেক ভুল এড়ানো যায়।
বিশ্বাসযোগ্যতা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
এই দশকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা।
কারণ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে যেকোনো খবর বানানো যায়। ছবি বানানো যায়। ভিডিও বানানো যায়। কণ্ঠ নকল করা যায়।
এই অবস্থায় পাঠককে বুঝতে হবে—কোনটা আসল, কোনটা নকল।
Reuters Institute-এর ২০২৬ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছে—AI chatbot, social video, এবং creator-led news—এই তিনটি জিনিস সংবাদ ব্যবস্থাকে বদলে দিচ্ছে।
মানে মানুষ আর শুধু পত্রিকা পড়ে না। তারা চ্যাটবটকে জিজ্ঞেস করে। ইউটিউবারের ভিডিও দেখে। ইনফ্লুয়েন্সারের পোস্ট পড়ে।
এই অবস্থায় সংবাদমাধ্যমকে আরও বেশি স্বচ্ছ হতে হবে। আরও বেশি যাচাই করতে হবে। আরও বেশি জবাবদিহি করতে হবে।
আগামী দশকে কী হবে
আমার ধারণা—একক কোনো প্ল্যাটফর্ম আর থাকবে না।
একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে অনেক কিছু হবে:
ছাপা কাগজ
অনলাইন পোর্টাল
ইউটিউব চ্যানেল
পডকাস্ট
ই-পেপার
সোশ্যাল মিডিয়া পেজ
নিউজলেটার
সব একসঙ্গে চলবে।
আর পাঠক বেছে নেবেন—কোন সময়ে কোনটা তার দরকার।
সকালে অফিসে যাওয়ার পথে ফোনে হেডলাইন। দুপুরে অফিসে বসে ইউটিউব ভিডিও। রাতে বাসায় এসে পত্রিকার সম্পাদকীয়। ছুটির দিনে ই-পেপার পড়া।
এই মিশ্র অভ্যাসটাই এখন স্বাভাবিক।
শেষ কথা
বাংলাদেশে অনলাইন নিউজ পোর্টালের যাত্রা সহজ ছিল না। সীমিত ইন্টারনেট, দুর্বল বিজ্ঞাপন বাজার, প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব—সব বাধা পেরিয়ে এটি এসেছে এখানে।
আজ আমরা যেখানে আছি—সেখানে অনলাইন আর প্রিন্ট শত্রু নয়। তারা দুই ভাই। একজনের শক্তি দ্রুততা, অন্যজনের শক্তি গভীরতা।
পাঠক হিসেবে আমাদের কাজ—দুটোই ব্যবহার করা। আর সবসময় মনে রাখা—তথ্য যাচাই করার দায়িত্ব আমাদেরও।
কারণ সংবাদ যত দ্রুত ছড়ায়, সত্য যাচাইয়ের অভ্যাসও তত জরুরি।
এই অভ্যাসটাই একজন সচেতন পাঠকের সবচেয়ে বড় সম্পদ।






