
বাংলা সংবাদপত্র মুদ্রণের বিস্ময়কর ইতিহাস: কাঠখোদাই হরফ থেকে আধুনিক অফসেট প্রেস
আমার দাদা বলতেন, তাঁর বাবার হাতে নাকি একটা পুরোনো ছাপাখানার হরফ ছিল। সীসার ছোট ছোট টুকরো। বাক্সে সাজানো। ওগুলো হাতে নিলে ওজন টের পাওয়া যেত। তিনি বলতেন, “এই একটা একটা অক্ষরের জন্য কত শ্রম দিতে হতো, তোরা কল্পনাও করতে পারবি না।”
আজ আমি যখন কম্পিউটারে বাংলা টাইপ করি, দাদার সেই কথাগুলো মনে পড়ে।
একটা “ক” লেখা আজ সেকেন্ডের কাজ। কিন্তু একসময় এই “ক” তৈরি করতে লাগত হাতের দক্ষতা, ছেনি, ধাতু, আর অসীম ধৈর্য।
আজকের লেখাটা সেই দিনগুলোর গল্প।
একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার
প্রথমেই একটা কথা বলে নিই।
অনেকে বলেন, “বাংলা সংবাদপত্র শুরু হয়েছিল কাঠখোদাই দিয়ে।”
কথাটা আধা সত্য।
সত্য হলো—কাঠের ব্লক দিয়ে ছবি আর কিছু লেখা ছাপা হতো। কিন্তু বাংলা সংবাদপত্রের মূল ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ধাতব চলনযোগ্য হরফ দিয়ে। মানে, সীসার ছোট ছোট অক্ষর, যেগুলো বারবার ব্যবহার করা যায়।
কাঠের ব্লক ছিল শুরু। কিন্তু সংবাদপত্রের আসল যুগ শুরু হয়েছিল ধাতব হরফে।
বাংলা হরফের যাত্রা শুরু হলো কোথা থেকে
ভারতীয় উপমহাদেশে ছাপাখানা এসেছিল ইউরোপীয়দের হাত ধরে।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য বলছে—বাংলা হরফের সবচেয়ে পুরোনো নমুনাগুলোর একটা পাওয়া যায় ১৬৮২ সালে প্যারিসে ছাপা একটা বইয়ে। তখন অবশ্য বাংলা হরফ সেভাবে তৈরি হয়নি। শুধু ছাপা হয়েছিল কোনোভাবে।
কিন্তু আসল কাজটা শুরু হলো ১৭৭৮ সালে।
সে বছর নাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড নামের এক ইংরেজ একটি বই প্রকাশ করতে চাইলেন। বইটার নাম ছিল “A Grammar of the Bengal Language”। ইংরেজি ব্যাকরণ, কিন্তু বাংলা অক্ষরে।
তিনি চাইলেন বাংলা হরফ বানাতে।
সাহায্যে এগিয়ে এলেন চার্লস উইলকিন্স। আর হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করলেন এক বাঙালি কারিগর। নাম তার পঞ্চানন কর্মকার।
তিনি তৈরি করলেন বাংলা হরফ। ধাতু দিয়ে। ছেনি দিয়ে। হাত দিয়ে।
ভাবুন তো—আজ আমরা কম্পিউটারে একটা “ক্ষ” লিখি। সেকেন্ডের কাজ। কিন্তু পঞ্চানন কর্মকারকে সেই “ক্ষ” বানাতে কতটা সময় দিতে হয়েছে? কতটা ধৈর্য দরকার হয়েছে?
সেই সময়ে যুক্তাক্ষর, কারচিহ্ন, মাত্রা—সব আলাদা করে বানাতে হতো। বাংলা লিপি ইউরোপীয় বর্ণমালার চেয়ে অনেক জটিল। তাই কাজটা কঠিন ছিল।
কিন্তু তিনি করেছেন। ইতিহাসে他的名字 লেখা হয়ে গেছে।
শ্রীরামপুর প্রেস: বাংলা ছাপার নতুন যুগ
১৮০০ সালে শ্রীরামপুরে একটা প্রেস প্রতিষ্ঠিত হলো।
নাম শ্রীরামপুর মিশন প্রেস।
পেছনে ছিলেন উইলিয়াম কেরি, জোশুয়া মার্শম্যান, উইলিয়াম ওয়ার্ড। আর সেখানে যোগ দিলেন পঞ্চানন কর্মকারও।
এই প্রেসটা কী করল?
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী—১৮০০ থেকে ১৮৩২ সালের মধ্যে এই প্রেস ৪৫টি ভাষায় বিপুলসংখ্যক বই ছাপল।
৪৫টি ভাষা!
ভাবুন তো কতটা কাজ হয়েছে।
কিন্তু শুধু বই ছাপা নয়। এখানে গড়ে উঠল একটা সম্পূর্ণ মুদ্রণব্যবস্থা। হরফ তৈরি, কাগজ প্রস্তুত, বই বাঁধাই, দক্ষ কর্মী তৈরি—সব।
আর ১৮১৮ সালে এখান থেকেই প্রকাশিত হলো সমাচার দর্পণ।
বাংলাপিডিয়া এটাকে প্রথম বাংলা সংবাদপত্র বলে উল্লেখ করেছে।
মানে—বাংলা ভাষায় সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু হলো সেই শ্রীরামপুর থেকেই। একই বছর কলকাতা থেকে বের হলো দিগদর্শন নামের একটা সাময়িকপত্রও।
ঢাকায় ছাপাখানা এলো যেভাবে
এখন আসি আমাদের ঢাকায়।
পূর্ববাংলায় মুদ্রণব্যবস্থার গল্প কিছুটা আলাদা।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য বলছে—রংপুরে ১৮৪৭-৪৮ সালের দিকে একটা ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ঢাকায় প্রথম ছাপাখানা বসান আলেকজান্ডার ফারবেখ।
কিন্তু শুরুর দিকে ঢাকার সেই প্রেসে বাংলা ছাপার ব্যবস্থা ছিল না। সেখানে ইংরেজি সংবাদপত্র বের হতো। নাম ছিল “The Dacca News”।
তাহলে ঢাকায় বাংলা ছাপা শুরু হলো কখন?
১৮৬০ সালে।
ঢাকায় প্রতিষ্ঠা পেল “বাংলা প্রেস” বা “বাংলা যন্ত্র”। এর পরপরই ঢাকার সংবাদপত্রের জগৎ বদলাতে শুরু করল।
আর ১৮৬১ সালে বাবুবাজারের “বাঙ্গালা যন্ত্র” থেকে প্রকাশিত হলো ঢাকা প্রকাশ।
এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার।
প্রথম আলোর ঐতিহাসিক আলোচনাতেও ঢাকা প্রকাশকে “ঢাকার প্রথম বাংলা সংবাদপত্র” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভাবুন—আজ ঢাকা থেকে কত পত্রিকা বেরোয়। কিন্তু সেই প্রথম পত্রিকাটার কথা কতজন জানেন?
একটা পত্রিকা ছাপার পেছনে যে শ্রম লেগেছে
এখন আমরা কম্পিউটারে দুই মিনিটে একটা পৃষ্ঠা সাজিয়ে ফেলি।
কিন্তু উনিশ শতকে?
সেই সময় পুরো ব্যাপারটা ছিল সম্পূর্ণ হাতের কাজ।
প্রতিটি অক্ষর আলাদা টাইপ। প্রতিটি যতিচিহ্ন আলাদা টুকরা। এই ছোট ছোট টুকরো একটা একটা করে সাজিয়ে লাইন বানাতে হতো। তারপর পৃষ্ঠা।
একটা ভুল অক্ষর পড়ে গেলে পুরো লাইন আবার সাজাতে হতো।
আর বাংলায় তো যুক্তাক্ষর আর কারচিহ্নের কাজ। “ক্ষ” একটা অক্ষর, কিন্তু ছাপার সময় সেটা কত টুকরোয় ভাঙতে হতো। “টি” লিখতে কত যত্ন লাগত।
তাই সেই সময়ের কম্পোজিটরদের দক্ষতা ছিল অসাধারণ।
আমরা যখন সংবাদপত্রের কথা ভাবি, তখন সাংবাদিকের কথা ভাবি। কিন্তু পেছনে কতজন ছিলেন?
কেউ খবর সংগ্রহ করতেন
কেউ লিখতেন
কেউ টাইপ সাজাতেন
কেউ প্রুফ পড়তেন
কেউ ছাপাতেন
কেউ কাগজ ভাঁজ করতেন
কেউ বিতরণ করতেন
সব মিলিয়েই একটা পত্রিকা তৈরি হতো।
লাইনোটাইপ: গতি এলো যেভাবে
বিশ শতকে এসে প্রযুক্তি বদলাতে শুরু করল।
১৯৪৭ সালের পর ঢাকার মুদ্রণশিল্প দ্রুত বাড়তে শুরু করল।
কারণ?
পাঠ্যবই দরকার। সরকারি কাগজ দরকার। সংবাদপত্র দরকার।
সব চাহিদা মেটাতে হলে দ্রুত ছাপার ব্যবস্থা দরকার।
তখনই এলো লাইনোটাইপ।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী—ঢাকার ইডেন প্রেসে বাংলা লাইনোটাইপ স্থাপিত হয়। আরও কিছু প্রেসে মনোটাইপের মতো উন্নত প্রযুক্তি এলো।
লাইনোটাইপ কী করত?
আগে একটা একটা অক্ষর সাজাতে হতো। লাইনোটাইপে একটা পুরো লাইন মেশিন তৈরি করে দিত।
এই গতি ছাপাখানার কাজ পুরোপুরি বদলে দিল।
আরেকটা জিনিস বদলাল—ছবি।
আগে ছবি ছাপতে হলে সেটার একটা ব্লক বানাতে হতো। এটা তৈরি করা কঠিন কাজ। ক্যামেরা, স্ক্রিন, দক্ষ কারিগর—সব দরকার ছিল।
এই কাজে বিশেষ নাম আছে। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।
তিনি হাফটোন আর ব্লক তৈরির কাজে দক্ষ ছিলেন। উপমহাদেশের মুদ্রণ-প্রযুক্তির ইতিহাসে他的名字 স্মরণীয়।
অফসেট প্রেস: আরেকটাই বড় বাঁক
লেটারপ্রেসের পাশাপাশি এলো অফসেট।
এটা কী আলাদা?
লেটারপ্রেসে অক্ষর সরাসরি কাগজে চাপা পড়ে। অফসেটে সেটা হয় না। এখানে একটা প্লেট তৈরি হয়। প্লেট থেকে কালি রোলারের মাধ্যমে কাগজে যায়।
এর সুবিধা কী?
বড় সংখ্যায় ছাপা যায়
ছাপা পরিষ্কার হয়
অক্ষর ক্ষয় হয় না
দ্রুত কাজ হয়
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী—পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ববাংলার কিছু প্রতিষ্ঠানে অফসেট প্রেস বসানো হয়।
ইস্ট পাকিস্তান কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি প্রেস
পাইওনিয়ার প্রিন্টিং প্রেস
এগুলো ছিল প্রথম দিকের নাম।
আর ১৯৬৭ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হলো গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউট।
এখানে পড়ানো হতো:
মুভেবল টাইপ
লেটারপ্রেস
অফসেট
গ্র্যাভিউর
স্ক্রিন প্রিন্টিং
পরে কম্পিউটারভিত্তিক মুদ্রণ
মানে—ছাপার কাজ এখন পড়াশোনার বিষয় হয়ে উঠল।
সীসার হরফ থেকে কম্পিউটার স্ক্রিন
এবার আসি সেই পরিবর্তনে, যা সবকিছু বদলে দিল।
কম্পিউটার।
বাংলাপিডিয়া আশির দশকের কম্পিউটারভিত্তিক পরিবর্তনকে মুদ্রণশিল্পে বড় রূপান্তর হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কী বদলাল?
আগে যা করতে লাগত:
সীসার হরফ
হাতের কম্পোজ
ছেনি
ছাঁচ
ব্লক
এখন তার বদলে:
কম্পিউটার
সফটওয়্যার
কীবোর্ড
মাউস
স্ক্রিন
লেখা তৈরি, সম্পাদনা, পৃষ্ঠা সাজানো—সব কম্পিউটারে।
সময় কমে এলো। ভুল কমে এলো।
এরপর ডিজিটাল ক্যামেরা, স্ক্যানার, ইমেজসেটার, প্লেট প্রসেসর, কম্পিউটার-টু-প্লেট—সব মিলিয়ে ছাপার কাজ হয়ে গেল অনেক দ্রুত।
একটা জিনিস কিন্তু বদলায়নি
আজকের সংবাদপত্রের ছাপার কাজ দেখলে উনিশ শতকের কারিগরের সঙ্গে সম্পর্ক বোঝা কঠিন।
কিন্তু একটা জিনিস আছে, যা দুই যুগকে যুক্ত করে।
পাঠকের কাছে সত্য তথ্য পৌঁছে দেওয়া।
সেই সময়ে হাতে হরফ সাজিয়ে ছাপা হতো। আজ কম্পিউটারে পৃষ্ঠা তৈরি হয়।
কিন্তু কাজের উদ্দেশ্য একই—নির্ভরযোগ্য তথ্য, সুস্পষ্ট ভাষায়, সময়ের মধ্যে।
যারা এই পথ তৈরি করেছেন
একটা কথা মনে রাখবেন।
আমরা যখন আজ পত্রিকা পড়ি, তখন অনেকের নাম জানি না।
কিন্তু এই পথটা তৈরি করেছেন কিছু মানুষ।
পঞ্চানন কর্মকার—যিনি প্রথম বাংলা হরফ বানিয়েছেন হাতে
চার্লস উইলকিন্স—যিনি সহায়তা করেছেন
উইলিয়াম কেরি—যিনি শ্রীরামপুর প্রেস গড়েছেন
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার—যিনি ঢাকা প্রকাশের প্রথম সম্পাদক ছিলেন
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী—যিনি ছবি ছাপার কাজ এগিয়ে নিয়েছেন
আর অসংখ্য নাম না জানা কারিগর—যারা প্রতিদিন ছাপাখানায় ঘাম ঝরিয়েছেন
তাদের শ্রমেই আজ আমরা বাংলায় পত্রিকা পড়তে পারি।
শেষ কথা
আমার দাদার সেই সীসার হরফের গল্প এখনো মনে আছে।
তিনি বলতেন, “একটা অক্ষর তৈরি করা মানে একটা ইতিহাস তৈরি করা।”
আজ আমি বুঝি তাঁর কথার মানে।
বাংলা সংবাদপত্রের মুদ্রণের ইতিহাস শুধু যন্ত্রের ইতিহাস নয়।
এটা হরফ বানানোর ইতিহাস।
কারিগরি দক্ষতার ইতিহাস।
শ্রমের ইতিহাস।
আর একটা ভাষাকে ছাপার অক্ষরে বাঁচিয়ে রাখার ইতিহাস।
কাঠের ব্লক থেকে ধাতব হরফ।
ধাতব হরফ থেকে হাতচালিত প্রেস।
প্রেস থেকে লেটারপ্রেস।
লেটারপ্রেস থেকে লাইনোটাইপ।
লাইনোটাইপ থেকে অফসেট।
অফসেট থেকে কম্পিউটার।
প্রতিটি ধাপ পরের ধাপের জন্য পথ তৈরি করেছে।
আজ সংবাদপত্র আছে কাগজে, ওয়েবসাইটে, ই-পেপারে, মোবাইলে।
কিন্তু সেই যাত্রা শুরু হয়েছিল একটা হাত দিয়ে।
একটা ছেনি দিয়ে।
একটা অক্ষর দিয়ে।
আর সেই প্রথম অক্ষরের নাম ছিল—
বাংলা।






