
শতবর্ষের পথচলা: বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো পত্রিকাগুলোর ঐতিহ্য ও অবদান
সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলানোর অভ্যাসটা আমাদের অনেকেরই। কিন্তু এই অভ্যাসটার শিকড় কতটা গভীরে, সেটা হয়তো আমরা ভাবি না। বাংলাদেশের সংবাদপত্র শুধু খবর পরিবেশনের যন্ত্র নয়, এগুলো আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম আর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নীরব সাক্ষী। এই লেখায় আমরা ফিরে তাকাব আমাদের সবচেয়ে পুরনো পত্রিকাগুলোর দিকে, যারা শতাব্দীর চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজও টিকে আছে। হকারের সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ থেকে স্মার্টফোনের স্ক্রিন—এই যাত্রাপথে কত গল্প জমে আছে, সেটাই আমরা খুঁজে দেখব।
বাংলাদেশের সংবাদপত্রের শিকড়
বাংলাদেশের সংবাদপত্রের গল্প আসলে শুরু হয় শ্রীরামপুরের ছাপাখানা থেকে। ১৮১৮ সালের ২৩ মে প্রকাশিত হয় সমাচার দর্পণ, যেটাকে অনেকে প্রথম বাংলা সংবাদপত্র হিসেবে গণ্য করেন। সম্পাদক ছিলেন জন ক্লার্ক মার্শম্যান। সাপ্তাহিক এই পত্রিকাটি প্রতি শনিবার বের হতো, মাসিক চাঁদা ছিল দেড় টাকা। সেই সময় এমন সংবাদপত্র চালানো ছিল দুঃসাহসের কাজ।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো ১৮৪৭ সালের আগস্টে প্রকাশিত রঙগপুর বার্তাবহ। পূর্ববঙ্গ থেকে প্রকাশিত প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল এটি, যার পেছনে অর্থায়ন করেছিলেন পরগনা কুন্ডির জমিদার কালীচন্দ্র রায়। পত্রিকাটি গ্রামীণ মানুষের সমস্যা নিয়ে লেখালেখি করত। ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত এটি টিকে ছিল।
শুরুর দিনের চ্যালেঞ্জ
তৎকালীন ছাপাখানায় অক্ষর সাজানো থেকে কাগজ পর্যন্ত—সবকিছুই ছিল হাতে গড়া। ব্রিটিশ শাসনামলে সংবাদপত্রের ওপর ছিল কড়া নজরদারি। তবুও সেই সময়ের সাহসী সম্পাদকেরা কলম ধরেছিলেন, কারণ তারা বুঝেছিলেন—একটি জনগোষ্ঠীর মুক্তির জন্য নিজের কণ্ঠস্বর থাকা জরুরি।
স্বাধীন বাংলাদেশের পথে সংবাদপত্র
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকায় পূর্ণাঙ্গ দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। এই শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম, যা আজও টিকে আছে।
দৈনিক সংবাদ ১৯৫১ সালের ১৭ মে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, প্রথম সম্পাদক খায়রুল কবির। ১৯৫০-৬০-এর দশকে পত্রিকাটি আইয়ুব খান সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এর অফিস-প্রেস পুড়িয়ে দেওয়া হয়, পুরো যুদ্ধকালীন সময় বন্ধ ছিল। দ্য সাংবাদকে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো দৈনিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দৈনিক ইত্তেফাক প্রথমে সাপ্তাহিক হিসেবে যাত্রা শুরু করে ১৯৪৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর, মওলানা ভাসানীকে চেয়ারম্যান করে। ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর এটি দৈনিকে রূপান্তরিত হয়। সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার হাত ধরে ইত্তেফাক ভাষা আন্দোলন থেকে ছয় দফা—প্রতিটি আন্দোলনে সোচ্চার ভূমিকা রাখে। ১৯৬৬ সালে সেন্সরশিপের মুখে পড়ে পত্রিকাটি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ইত্তেফাক অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
দৈনিক আজাদী ১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল খালেক, যিনি ছিলেন এই অঞ্চলের প্রথম মুসলিম ইঞ্জিনিয়ার। আজাদীকে বলা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র। আজও চট্টগ্রাম থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে এটি।
এই তিনটি সংবাদপত্রই বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে কলমকে হাতিয়ার বানিয়েছিল।
ডিজিটাল যুগে ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার রূপান্তর
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবাদপত্রের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তবে গত দুই দশকে ছবিটা অনেক বদলে গেছে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ছাপা পত্রিকার পাঠক ছিল ১ কোটি ৮৬ লাখ, যা ২০২১ সালে ছিল ২ কোটি ৯২ লাখ। অন্যদিকে মোবাইলে সংবাদ পাঠের হার বাড়ছে লাফিয়ে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো পত্রিকাগুলোর ঐতিহ্য আর ইতিহাসের পাশাপাশি আজকের ডিজিটাল যুগে এসব পত্রিকা পড়ার সহজ রাস্তাও জরুরি। আর সেটার জন্যই আছে banglanewspapers.net—একটি ডিরেক্টরি, যেখানে বাংলাদেশের ১০০টিরও বেশি সংবাদমাধ্যম এক জায়গায় সাজানো আছে। দৈনিক সংবাদ, ইত্তেফাক, আজাদীর মতো ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ থেকে শুরু করে প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠের ই-পেপার—সব এক পেজে। ৩০টি জাতীয় বাংলা দৈনিক, ১৮টি ই-পেপার, ১৫টি ইংরেজি পত্রিকা, ২৪টি টিভি নিউজ চ্যানেল আর ১২টি রেডিও স্টেশন—সব মিলিয়ে পাঠকের জন্য পুরো সংবাদজগৎ এক ঠিকানায়। কোনো লগইন নেই, সাবস্ক্রিপশন নেই; শুধু পছন্দের পত্রিকায় ক্লিক করে সরাসরি সেই সংবাদমাধ্যমের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা। সকালের খবর পড়তে হাতে কাগজ থাকুক বা স্মার্টফোনের স্ক্রিন—সবচেয়ে সহজ রাস্তাটা এখানেই।
পাঠক ও মিডিয়া হাউসে প্রভাব
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ বলছে, সংবাদপত্র না পড়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ৪৬ শতাংশ মানুষ ‘প্রয়োজন অনুভব করেন না’ বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে অনলাইন সংবাদপত্র ও ই-পেপারের চাহিদা বাড়ছে। পুরনো পত্রিকাগুলোও এখন অনলাইন সংস্করণ, ই-পেপার ও মোবাইল অ্যাপ চালু করেছে। দৈনিক সংবাদ, ইত্তেফাক, আজাদী—সবাই নিজেদের ডিজিটাল উপস্থিতি শক্ত করেছে।
পাঠকের জন্য ব্যবহারিক করণীয়
ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা পড়ার সময় কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা ভালো।
পুরনো পত্রিকার আর্কাইভ ঘেঁটে গবেষণা করা যায়—ইত্তেফাক, সংবাদ ও আজাদীর ই-পেপারে পুরোনো সংখ্যা সংরক্ষিত আছে।
জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ মিলিয়ে পড়লে সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়।
একটিমাত্র সংবাদমাধ্যমে নির্ভর না করে অন্তত দুই-তিনটি পত্রিকার খবর মিলিয়ে দেখলে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা বোঝা সহজ হয়।
ছাপা পত্রিকা হাতে না পেলে ই-পেপার ব্যবহার করা যায়।
সংবাদপত্রের তালিকা থেকে বিভিন্ন পত্রিকা খুঁজে নিয়ে নিজের পাঠ-তালিকা তৈরি করে নিন।
আগামী দশকে কী হতে পারে
প্রযুক্তি বদলাবে, কিন্তু ভালো সাংবাদিকতার চাহিদা কমবে না। ভবিষ্যতে ঐতিহ্যবাহী পত্রিকাগুলোকে টিকে থাকতে হলে সাবস্ক্রিপশন, আর্কাইভ, মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট এবং AI-ভিত্তিক ব্যক্তিগতকৃত সংবাদ সেবায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে টানতে হলে ভিডিও ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকতে হবে।
FAQ
বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো দৈনিক পত্রিকা কোনটি?
দৈনিক সংবাদ, ১৯৫১ সালের ১৭ মে প্রতিষ্ঠিত। এটিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো দৈনিক পত্রিকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রথম বাংলা সংবাদপত্র কোনটি?
সমাচার দর্পণ, ১৮১৮ সালের ২৩ মে প্রকাশিত। জন ক্লার্ক মার্শম্যান ছিলেন এর সম্পাদক।
দৈনিক ইত্তেফাক কবে দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরু করে?
১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর। এর আগে এটি সাপ্তাহিক হিসেবে ১৯৪৯ সাল থেকে প্রকাশিত হচ্ছিল।
দৈনিক আজাদী কোন শহর থেকে প্রকাশিত হয়?
চট্টগ্রাম থেকে। ১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক এটি প্রতিষ্ঠা করেন।
Key Takeaways
সমাচার দর্পণ (১৮১৮) প্রথম বাংলা সংবাদপত্র।
রঙগপুর বার্তাবহ (১৮৪৭) পূর্ববঙ্গ থেকে প্রকাশিত প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক।
দৈনিক সংবাদ (১৯৫১), ইত্তেফাক (১৯৫৩ দৈনিক), আজাদী (১৯৬০)—স্বাধীনতা সংগ্রামের সাক্ষী।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এই পত্রিকাগুলোর অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তবু থেমে যায়নি।
ছাপা পত্রিকার পাঠক কমছে, ডিজিটাল সংস্করণে ঝুঁকছেন পাঠকেরা।
বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাস কোনো একদিনে লেখা হয়নি। শ্রীরামপুরের ছাপাখানা থেকে চট্টগ্রামের কোহিনুর প্রেস—প্রতিটি অক্ষর জমা হয়েছে রক্ত, ঘাম আর অদম্য সাহসে। আজ আমরা যখন স্মার্টফোনে খবর পড়ি, তখন সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকারই বহন করি। প্রযুক্তি বদলাবে, কিন্তু সত্যের সন্ধানে কলম ধরার সাহসটা চিরকাল থাকবে।







